সনাতন ধর্মে শিক্ষার গুরুত্ব: শাস্ত্র, দর্শন ও বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি
নিজস্ব প্রতিবেদক,
শিক্ষা ডেস্ক
সনাতন ধর্মে শিক্ষা কোনো আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি বা কেবল জীবিকার উপকরণ হিসেবে বিবেচিত হয়নি। বরং শিক্ষাকে মানুষের চরিত্র গঠন, নৈতিকতা, আত্মজ্ঞান এবং সমাজে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্র, উপনিষদ, বেদ ও গীতায় শিক্ষাকে মানবজীবনের মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
বেদ ও উপনিষদে শিক্ষার সংজ্ঞা
ঋগ্বেদ ও যজুর্বেদে “বিদ্যা” শব্দটি বারবার ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ কেবল তথ্য জানা নয়—সত্যকে উপলব্ধি করা। উপনিষদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—
> “বিদ্যা বিমুক্তয়ে”
> অর্থাৎ, বিদ্যা মানুষকে অজ্ঞতা ও বন্ধন থেকে মুক্ত করে।
এখানে শিক্ষা মানে মুখস্থ বিদ্যা নয়, বরং প্রশ্ন করা, যুক্তি করা এবং নিজেকে জানা।
গুরুকুল ব্যবস্থা: ব্যবহারিক ও নৈতিক শিক্ষা
সনাতন ধর্মের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা ছিল গুরুকুলভিত্তিক। সেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু শাস্ত্র পাঠ করত না, বরং—
* শৃঙ্খলা
* আত্মসংযম
* শ্রমের মর্যাদা
* প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান
এসব শিখত। শিক্ষা ছিল জীবনঘনিষ্ঠ, ক্লাসরুমকেন্দ্রিক নয়। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে এখানেই বড় পার্থক্য।
গীতা ও শিক্ষার উদ্দেশ্য
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শিক্ষা নিয়ে সবচেয়ে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়। কৃষ্ণ স্পষ্ট বলেন—
> “স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ”
অর্থাৎ, নিজের দায়িত্ব ও কর্ম সম্পর্কে সচেতন হওয়াই প্রকৃত জ্ঞান। গীতার মতে শিক্ষা তখনই মূল্যবান, যখন তা কর্মে রূপ নেয়।
নারী শিক্ষার অবস্থান
জনপ্রিয় ধারণার বিপরীতে, সনাতন ধর্মে নারী শিক্ষাকে অস্বীকার করা হয়নি। গার্গী, মৈত্রেয়ী, লোপামুদ্রা—এই নারী ঋষিরা উপনিষদীয় বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। সমস্যা ধর্মে নয়, বরং পরবর্তী সামাজিক বিকৃতিতে।
আধুনিক প্রেক্ষাপটে সনাতন শিক্ষাদর্শন
বর্তমান সময়ে যখন শিক্ষা কেবল চাকরি ও নম্বরের প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ, তখন সনাতন ধর্মের শিক্ষাদর্শন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। এখানে শিক্ষা মানে—
* নৈতিকতা ছাড়া জ্ঞান নয়
* মানবিকতা ছাড়া বুদ্ধিমত্তা নয়
* দায়িত্ব ছাড়া সাফল্য নয়
উপসংহার
সনাতন ধর্মে শিক্ষা কোনো অলৌকিক ধারণা নয়, বরং গভীরভাবে যুক্তিনির্ভর ও বাস্তবমুখী। এই ধর্মে শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য মানুষ তৈরি করা—কেবল দক্ষ কর্মী নয়, **দায়িত্বশীল নাগরিক ও সচেতন মানব**।



%20.png)
No comments: