আধুনিক চিকিৎসার আগেই কি ‘হেলথ সায়েন্স’ জানত সনাতন ধর্ম? শাস্ত্র, আয়ুর্বেদ ও বাস্তবতার বিশ্লেষণ
প্রযুক্তি ও চিকিৎসা
মানবসভ্যতার ইতিহাসে চিকিৎসা বিদ্যার সূচনা কোথায়—এই প্রশ্নে ভারতীয় উপমহাদেশের সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্রগুলো বারবার আলোচনায় আসে। আধুনিক মেডিসিনের বহু ধারণার সঙ্গে সনাতন ধর্মভিত্তিক আয়ুর্বেদ ও শাস্ত্রীয় নির্দেশনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন গবেষকরা। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এগুলো ধর্মীয় বিশ্বাস, নাকি প্রাচীন বৈজ্ঞানিক অনুশীলন?
সনাতন ধর্মে স্বাস্থ্যকে শুধু রোগমুক্তি হিসেবে নয়, **শরীর-মন-আত্মার সামগ্রিক ভারসাম্য** হিসেবে দেখা হয়েছে। ঋগ্বেদ ও অথর্ববেদে রোগ, ঔষধ ও চিকিৎসার স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশেষ করে অথর্ববেদে জ্বর, চর্মরোগ, মানসিক অস্থিরতা ও বিষক্রিয়ার চিকিৎসার বর্ণনা রয়েছে, যা নিছক প্রার্থনা নয়—বরং উদ্ভিদভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতির ইঙ্গিত দেয়।
আয়ুর্বেদ: ধর্ম না চিকিৎসাবিজ্ঞান?
চরক সংহিতা ও সুশ্রুত সংহিতা—এই দুটি গ্রন্থকে আধুনিক মেডিসিনের প্রাথমিক পাঠ্য হিসেবেও ধরা হয়।
চরক সংহিতা রোগ নির্ণয়, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের উপর জোর দেয়।
সুশ্রুত সংহিতা, শল্যচিকিৎসার কথা বলে—নাক পুনর্গঠন, অস্ত্রোপচারের যন্ত্র, এমনকি সেলাইয়ের পদ্ধতির বর্ণনাও পাওয়া যায়।
এখানে প্রশ্ন ওঠে—এগুলো কি কেবল ধর্মীয় কল্পনা? বাস্তবে ইতিহাসবিদরা মানছেন, প্রাচীন ভারতে অস্ত্রোপচার চালু ছিল, যা নিছক বিশ্বাস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
রোগের কারণ নিয়ে শাস্ত্রের অবস্থান
সনাতন ধর্ম রোগকে ‘পাপের ফল’ বলে সরলীকরণ করেনি—যেটা অনেকেই দাবি করেন। বরং আয়ুর্বেদে রোগের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে:
অস্বাস্থ্যকর খাদ্য
অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন
মানসিক চাপ ও অসামঞ্জস্য
এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক লাইফস্টাইল ডিজিজ তত্ত্বের সঙ্গে সরাসরি মিলে যায়।
সীমাবদ্ধতা কোথায়?
এখানে বাস্তববাদী প্রশ্ন জরুরি। সনাতন ধর্মীয় চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো **সব রোগের সমাধান নয়**। সংক্রমণ, ক্যান্সার বা জটিল সার্জারিতে আধুনিক চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে এগুলো দাঁড় করানো যুক্তিবিরুদ্ধ। শাস্ত্র কোথাও আধুনিক মেডিসিনকে অস্বীকার করতেও বলেনি—বরং সময়ের সঙ্গে জ্ঞানের বিকাশকে স্বীকার করেছে।
উপসংহার
সনাতন ধর্মের চিকিৎসা-ধারণা অন্ধ বিশ্বাস নয়, আবার অলৌকিক ম্যাজিকও নয়। এটি মূলত প্রাচীন অভিজ্ঞতালব্ধ চিকিৎসা জ্ঞান, যা আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে বর্তমান সময়ে একে বিজ্ঞানসম্মত যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রচার করা যেমন ভুল, তেমনি একে পুরোপুরি অস্বীকার করাও বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা।



%20.png)
No comments: