‘হলি’ ঘিরে জাতপাতের বিতর্ক: পুরাণ, রাজনীতি ও বিভেদের নতুন বয়ান
নিজস্ব প্রতিবেদক,
![]()
ভারতজুড়ে দোলযাত্রা ও হলি উৎসবকে কেন্দ্র করে আবারও মাথাচাড়া দিয়েছে জাতপাতের রাজনৈতিক বিতর্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু সংগঠনের বক্তব্যে দাবি করা হচ্ছে, হোলিকা দহনের সঙ্গে নাকি বর্ণবৈষম্যের ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে। তবে ধর্মীয় পণ্ডিত ও ইতিহাস বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ এই ব্যাখ্যাকে ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
পুরাণের কাহিনি: নৈতিক শিক্ষার প্রতীক
হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু ব্রহ্মার বরপ্রাপ্ত হয়ে দেবতা ও মানবকে তুচ্ছজ্ঞান করতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁর পুত্র প্রহ্লাদ ছিলেন বিষ্ণুভক্ত। পুত্রের ভক্তি সহ্য করতে না পেরে হিরণ্যকশিপু তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেন। এ কাজে সহযোগিতা করেন তাঁর বোন হোলিকা, যিনি আগুনে অক্ষত থাকার বর পেয়েছিলেন।
কাহিনি অনুযায়ী, প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করলেও শেষ পর্যন্ত প্রহ্লাদ রক্ষা পান এবং হোলিকাই দগ্ধ হয়ে মারা যান। ধর্মীয় ব্যাখ্যায় এটি অহংকার ও অধর্মের পরাজয় এবং ভক্তি ও ন্যায়ের বিজয়ের প্রতীক। এই ঘটনাকে স্মরণ করেই দোলের আগের রাতে ‘হোলিকা দহন’ পালিত হয়।
জাতপাতের ব্যাখ্যা: ইতিহাস না রাজনৈতিক নির্মাণ?
কিছু গোষ্ঠী দাবি করছে, হোলিকা নাকি তথাকথিত নিম্নবর্ণের প্রতিনিধি ছিলেন এবং তাঁর দহন উচ্চবর্ণের আধিপত্যের প্রতীক। তারা নিজেদের আম্বেদকরপন্থী বা নব্য বৌদ্ধ পরিচয়ে এই বক্তব্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। তবে পুরাণের মূল বয়ানে হোলিকা, হিরণ্যকশিপু ও প্রহ্লাদ—তিনজনই একই দৈত্যবংশের সদস্য। কোথাও তাদের জাতিগত অবস্থান নিয়ে কোনো উল্লেখ নেই।
ধর্মতত্ত্ববিদদের মতে, হোলিকার ঘটনাকে জাতপাতের কাঠামোয় ফেলার চেষ্টা করলে মূল পুরাণকাহিনির ধর্ম-অধর্মের দ্বন্দ্বকে আড়াল করা হয়। এটি পারিবারিক ও আদর্শিক সংঘাতের গল্প—কোনো সামাজিক বর্ণবিভাজনের দলিল নয়।
উৎসব বনাম রাজনৈতিক মেরুকরণ
হলি ঐতিহ্যগতভাবে বসন্তের আগমন, সামাজিক সম্প্রীতি ও আনন্দের উৎসব। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে এদিন আগুন জ্বালিয়ে অশুভ শক্তির প্রতীকী দহন করা হয়। মহারাষ্ট্রসহ কয়েকটি অঞ্চলে লোকাচার অনুযায়ী আগুন প্রদক্ষিণের প্রথাও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সমসাময়িক রাজনীতিতে ধর্মীয় প্রতীককে নতুন অর্থে ব্যাখ্যা করা নতুন কিছু নয়। তবে প্রশ্ন উঠছে—প্রাচীন পুরাণের একটি নৈতিক কাহিনিকে আধুনিক বর্ণরাজনীতির প্রেক্ষাপটে দাঁড় করানো কতটা ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণযোগ্য?
বিশেষজ্ঞদের মত
সমাজবিজ্ঞানীদের একটি অংশ বলছেন, প্রাচীন কাহিনির পুনর্ব্যাখ্যা সমাজচর্চার অংশ হতে পারে। কিন্তু যদি তা প্রমাণভিত্তিক না হয়ে কেবল বিভাজন সৃষ্টির হাতিয়ার হয়, তবে তা সামাজিক সম্প্রীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
ধর্মীয় মহলের বক্তব্য, হোলিকা দহন মূলত অন্যায় ও অত্যাচারের প্রতীকী পরাজয়—এটিকে জাতপাতের প্রতীক বানানোর প্রচেষ্টা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
উপসংহার
হোলিকা দহনের কাহিনি শতাব্দী ধরে নৈতিক শিক্ষার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। বর্তমান বিতর্ক দেখাচ্ছে, ধর্মীয় উৎসবও এখন রাজনৈতিক ব্যাখ্যার বাইরে নয়। তবে ইতিহাস ও ধর্মগ্রন্থে স্পষ্ট উল্লেখ না থাকলে জাতপাতের যুক্তি দাঁড় করানো কতটা যৌক্তিক—সেই প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।



%20.png)
No comments: