শুরু হলো অগ্নিঝরা মার্চ: চূড়ান্ত লড়াইয়ের পথে বাঙালির অগ্রযাত্রা
নিজস্ব প্রতিবেদক,
আজ ১ মার্চ। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অনন্য চিহ্নিত দিন। আজ থেকেই শুরু হলো 'অগ্নিঝরা মার্চ'। ১৯৭১ সালের এই মাসেই বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম চূড়ান্ত রূপ নেয়। দীর্ঘ ২৩ বছরের শোষণ-বঞ্চনার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শেষ যুদ্ধে নামার আগে এই মার্চেই ছিল বাঙালির চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও অগ্রযাত্রার মহাকাব্যিক ইতিহাস ।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে বাধা দেয় পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। এরই জের ধরে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এক বেতার ভাষণে ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হঠাৎ করেই স্থগিত ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই যেন অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিল বাঙালির মনে ।
সেদিন ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান ও বিশ্ব একাদশের মধ্যকার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ চলছিল। অধিবেশন স্থগিতের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই খেলা ফেলে দর্শকরা রাজপথে নেমে আসেন। উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকাসহ গোটা পূর্ব বাংলা। মিছিলের নগরীতে পরিণত হয় ঢাকা। ছাত্র-জনতা ফুঁসে ওঠে 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর' শ্লোগানে ।
পরিস্থিতির এমন বাঁক পরিবর্তনে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন জাতির পিতা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মতিঝিলের হোটেল পূর্বাণীতে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানা ৫ দিনের হরতাল ও অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন এবং ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিশাল জনসভার ঘোষণা দেন ।
তারই ধারাবাহিকতায় ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের লাখো জনতার উদ্দেশ্যে দেওয়া সেই কালজয়ী ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট ঘোষণা দেন, **"এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।"** তিনি তাঁর বজ্রকণ্ঠে নির্দেশ দেন, "প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে" । এই ভাষণের মাধ্যমে তিনি কার্যত একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পথ দেখান। মাত্র ১৮ মিনিটের এই ভাষণ বিশ্বের ইতিহাসে যুদ্ধ-পূর্ব উদ্দীপনা তৈরির সবচেয়ে সফল দলিল হিসেবে বিবেচিত ।
এরপর পুরো মার্চ মাস জুড়ে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় কার্যত অচল করে রাখা হয় পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থা। অন্যদিকে, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে জেনারেল টিক্কা খানের নেতৃত্বে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র ঢাকায় আসতে থাকে। ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী শুরু করে 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নির্মম গণহত্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ বিভিন্ন স্থানে নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা ।
ঠিক সেই মুহূর্তে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং গ্রেফতার হন। তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে। শুরু হয় নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, যা চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনে ১৬ ডিসেম্বর ।
অগ্নিঝরা মার্চ বাঙালির জীবনে তাই চিরন্তন গৌরবের মাস। এই মাসের প্রতিটি দিন ত্যাগ, সংগ্রাম ও স্বাধীনতার এক একটি হীরক খণ্ড। আজ ৫৪ বছর পরেও সেই চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে বীর শহীদদের এবং বঙ্গবন্ধুর অবিসংবাদিত নেতৃত্বকে ।


%20.png)
No comments: