এক মিনিটের সূর্য প্রণাম: অহংকার ভাঙা থেকে মানসিক শৃঙ্খলা বয়ে আনবে সুখ-সমৃদ্ধি।
নিজস্ব প্রতিবেদক,
সনাতন ধর্মে সকালের ঘুম থেকে উঠে সূর্যকে প্রণাম করার প্রথা কোনো হঠাৎ গড়ে ওঠা আচার নয়, আবার এটাকে অন্ধ বিশ্বাস বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই আচারের পেছনে ধর্মতত্ত্ব, শাস্ত্রীয় ভাবনা এবং বাস্তব জীবনের গভীর যুক্তি একসঙ্গে কাজ করেছে। সূর্য এখানে প্রতীকী কোনো শক্তি নন, তিনি প্রত্যক্ষ। যাকে চোখে দেখা যায়, যার আলো-তাপে জীবন চলে, যার অনুপস্থিতিতে পৃথিবীতে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব সম্ভব নয়। এই বাস্তব সত্যকে স্বীকার করাই সূর্য প্রণামের মূল দর্শন।
বেদ ও উপনিষদে সূর্যকে প্রাণের আধার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ঋগ্বেদে বলা হয়েছে—“সূর্য আত্মা জগৎস্থাবরজঙ্গমস্য”, অর্থাৎ সূর্যই চলমান ও অচল সমগ্র জগতের আত্মা। এই বক্তব্য কোনো কাব্যিক অতিশয়োক্তি নয়। সূর্য না থাকলে মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ—কিছুই থাকত না। তাই সূর্যকে প্রণাম মানে কোনো অদৃশ্য শক্তির কাছে মাথা নোয়ানো নয়, বরং জীবনের মৌলিক উৎসকে স্বীকার করা।
সূর্যের প্রণাম মন্ত্র-
ওঁ জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম।
ধ্বান্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোহস্মি দিবাকরম্।
ভোরবেলার সময়কে সনাতন ধর্মে বলা হয় ব্রাহ্ম মুহূর্ত। এই সময়কে গুরুত্ব দেওয়ার পেছনে নিছক ধর্মীয় আবেগ কাজ করেনি। ভোরে পরিবেশ সবচেয়ে শান্ত, বাতাস বিশুদ্ধ, মন তুলনামূলকভাবে স্থির থাকে। সূর্যের আলো তখন তীব্র নয়, বরং কোমল ও সহনীয়। এই সময়ে সূর্যের দিকে মুখ করে প্রণাম করা মানে নিজের শরীর ও মনকে দিনের ছন্দে ঢুকিয়ে দেওয়া। ধর্ম এখানে মানুষের মনস্তত্ত্ব ও দৈনন্দিন আচরণ গভীরভাবে বুঝে কাজ করেছে।
সূর্য প্রণামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অহংকার ভাঙা। প্রতিদিন দিনের শুরুতে সূর্যের দিকে তাকিয়ে মাথা নোয়ানোর একটি স্পষ্ট মানসিক বার্তা আছে—মানুষ সর্বশক্তিমান নয়। আধুনিক মানুষের বড় সমস্যা হলো অহংকার নিয়ে দিন শুরু করা। নিজেকে সব কিছুর কেন্দ্র ভাবা। সনাতন দর্শন ঠিক উল্টো শিক্ষা দেয়। দিন শুরু হয় বিনয় দিয়ে, কৃতজ্ঞতা দিয়ে। এই অভ্যাস দীর্ঘদিন চললে মানুষের আচরণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং মানসিক ভারসাম্যে প্রভাব পড়ে। তাই এটি শুধু ধর্মীয় আচরণ নয়, এটি মানসিক শৃঙ্খলা তৈরির একটি কার্যকর পদ্ধতি।
গায়ত্রী মন্ত্রের দিকেও তাকালে এই দর্শন আরও পরিষ্কার হয়। গায়ত্রী মন্ত্র সূর্যকে উদ্দেশ্য করে রচিত, কিন্তু সেখানে ধন, ক্ষমতা বা অলৌকিক সাফল্য চাওয়া হয়নি। সেখানে বলা হয়েছে—আমাদের বুদ্ধিকে প্রেরণা দাও। অর্থাৎ সনাতন ধর্ম মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতিকে প্রাধান্য দিয়েছে। এই জায়গায় ধর্ম কুসংস্কার থেকে নিজেকে আলাদা করে। সূর্য প্রণাম এখানে চিন্তার স্বচ্ছতা ও আত্মবিকাশের প্রতীক।
স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও সূর্য প্রণামের বাস্তব মূল্য আছে। ভোরের সূর্যালোক দেহে ভিটামিন-ডি উৎপাদনে সাহায্য করে, শরীরের জৈবিক ঘড়ি ঠিক রাখে এবং মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতা কমাতে ভূমিকা রাখে। প্রাচীন ঋষিরা আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরিভাষা জানতেন না, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তারা এই প্রভাব বুঝেছিলেন। তাই সূর্য প্রণামকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করা হয়েছিল।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা জরুরি—সূর্য প্রণাম করলে হঠাৎ ভাগ্য বদলে যাবে, সব পাপ মুছে যাবে বা অলৌকিক সাফল্য আসবে—এই ধরনের দাবি সনাতন ধর্মের মূল দর্শনের সঙ্গে যায় না। এগুলো ভণ্ডামি। আসল লাভ হলো দিনের শুরুতে শৃঙ্খলা তৈরি হওয়া, মন সংযত থাকা, শরীর প্রকৃতির ছন্দে চলা এবং জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা তৈরি হওয়া। সনাতন ধর্ম এখানে বাস্তববাদী ও সংযত।
সবশেষে বলা যায়, সকালের সূর্য প্রণাম কোনো পুরনো কুসংস্কার নয়, আবার কোনো জাদুকরী প্রক্রিয়াও নয়। এটি প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, অহংকার ভাঙার অনুশীলন এবং শরীর-মনকে সঠিক পথে পরিচালনার একটি সচেতন অভ্যাস। যারা এটিকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেয়, তারা এর দর্শন বোঝে না। আর যারা এটিকে ম্যাজিক বানিয়ে তোলে, তারাও সত্যটাকে বিকৃত করে। সনাতন ধর্ম এখানে স্পষ্ট—সূর্য পূজা মানে জীবনকে শৃঙ্খলায় আনা, অলৌকিক সুবিধা আদায় করা নয়।



%20.png)
No comments: